স্নিগ্ধাসহ তিনজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন রথিশ চন্দ্র হত্যার মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের রথিশ চন্দ্রের স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকসহ তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্যদিকে রথিশ চন্দ্রের স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের প্রেমিক ও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুল ইসলামকে পুলিশ দশদিনের রিমান্ডে নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার রথিশ চন্দ্রের স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকসহ তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, রংপুর তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন রথিশ চন্দ্র ভৌমিক। ওই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করতেন রথিশ চন্দ্রের স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিক ও কামরুল ইসলাম।

শিক্ষক কামরুল ইসলাম ও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা স্নিগ্ধা ভৌমিকের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে অবাক হয়ে যায় র‌্যাব। ২ বছর আগে তাদের মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা প্রতিদিন দুজনে ৩০ থেকে ৩৫ বার মোবাইলে কথা বলতেন। রথিশ চন্দ্রের মোবাইল নম্বর ট্র্যাকিং করতে গিয়েই তারা এই রহস্য উন্মোচনের সূত্র খুঁজে পান।

তাদের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি রথিশ চন্দ্র জানতে পারলে তা নিয়ে কথাকাটাকাটি হয়। বিষয়টি নিয়ে গত শুক্রবার (৩০ মার্চ) পারিবারিকভাবে সালিশ করার সিদ্ধান্ত ছিল। সালিশে বসার আগের দিনই রথিশকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন দীপা ও কামরুল। সেই অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে রথিশ বাসায় ফেরার পর খেতে বসলে তার খাবারে ১০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। তার মেয়ের খাবারে দেওয়া হয় তিনটি ঘুমের ওষুধ। খাওয়ার পর বাবা-মেয়ে অচেতন হয়ে পড়লে আগে থেকেই বাসার বাইরে অপেক্ষা করা কামরুল বাসায় ঢোকে। এরপর রথিশ চন্দ্রকে শ্বাসরোধে হত্যা করে দীপা ও কামরুল। রাতে লাশটি বাসাতেই ছিল। সকালে রথিশ চন্দ্রের লাশ একটি আলমারিতে ভরে একটি ভ্যান ভাড়া করে এনে তাতে করে নিয়ে যাওয়া হয় কামরুলের তাজহাট মোল্লারপাড়ার নির্মাণাধীন বাড়িতে। সেখানে আগে থেকেই তৈরি করা গর্তে তা পুঁতে রাখা হয়। এ কাজে তাকে সহায়তা করে দুই শিক্ষার্থী সবুজ ও রোকন।

গত ৩০ মার্চ রথিশ চন্দ্রের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরই মাঠে নামে র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেই তদন্তে নামেন। র‌্যাব ও পুলিশ তার মোবাইল ট্র্যাক করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পরীক্ষা করে দেখতে পায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকেই মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ ছিল। নম্বর দুটি ট্র্যাকিং করে মঙ্গলবার র‌্যাব নিশ্চিত হয়, সেগুলো বাসার আশপাশেই রয়েছে। অনুসন্ধানের পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় র‌্যাব দীপা ভৌমিককে চ্যালেঞ্জ করে, রথিশের মোবাইল ফোন দুটি তার কাছেই আছে। পরে তিনি এ তথ্য স্বীকার করে নেন। র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রাখলে রাত ১১টার দিকে রথিশ হত্যার কথা স্বীকার করে নেন দীপা।

এর আগে পুলিশ রথিশের স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার প্রেমিক একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে। ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে শনিবার রাতে নগরীর রাধাবল্লভের বাড়ি থেকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় কামরুল ইসলামকে। তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরপর হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানান কামরুল। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মোল্লাপাড়ায় কামরুলের নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে রথিশ চন্দ্রের লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব।

তারা আরো জানান, রথিশ চন্দ্র ভৌমিককে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস আগেই। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৯ মার্চ রাতে নিজ ঘরেই খুন করা হয় রথিশ চন্দ্রকে। পিপির স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের সহায়তায় তার কথিত প্রেমিক কামরুল তাকে হত্যা করেন।

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে বাবু সোনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান কামরুল। সকাল ৯টার দিকে তিনি একটি ভ্যান নিয়ে আসেন। ভ্যানে তোলার কাজে সহায়তাকারী তিন ব্যক্তিকে কামরুল মাস্টার তার সঙ্গে নিয়ে আসেন। মরদেহ গুমের উদ্দেশে নিহতের স্ত্রী দীপা আলমারি পরিবর্তনের কথা বলে কামরুলের সহায়তায় বাবু সোনার মরদেহ আলমারিতে ভরেন। স্নিগ্ধা আলমারিতে করে স্বামীর লাশ নিয়ে যায় আধা কিলোমিটার দূরে কামরুলের ভাই খাদেমুল ইসলামের মোল্লাপাড়ার নির্মাণাধীন একটি বাড়িতে।পরপর তিন ব্যক্তির সহায়তায় ওই মরদেহ তাজহাট মোল্লাপাড়ার নির্মাণাধীন ওই বাড়িতে পুঁতে রাখা হয়।

তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী মোল্লাপাড়ার রবিউল ইসলামের ছেলে সবুজ ইসলাম (১৭) ও রফিকুল ইসলামের ছেলে রোকনুজ্জামান (১৭) গর্তের মাটি ভরাটে সহায়তা করেন। ওই দুই শিক্ষার্থী জানান, ২৬ মার্চ শিক্ষক কামরুল ইসলামের নির্দেশে ৩০০ টাকার বিনিময়ে তারা গর্ত খুঁড়ে রাখেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বালু দিয়ে গর্ত ঢেকে রাখেন। কামরুল তাদের শিক্ষক হওয়ায় তার আদেশ পালন করেছেন তারা। কামরুল স্নিগ্ধার সহকর্মী এবং তিনি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

এদিকে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন রথিশ চন্দ্র। একইসঙ্গে জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুর ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষীও তিনি।

এছাড়া রথীশ চন্দ্র রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক, জেলা আইনজীবী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি রংপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক বাবু সোনা নামে পরিচিত এই আইনজীবী হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও রংপুর জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি।

ব্যক্তি জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা ছিলেন বাবু সোনা। ছেলে দীপ্ত ভৌমিক রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এবং মেয়ে অনিকা ভৌমিক রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*