যেসব কারণে ফুটবলে ছেলেরা ব্যর্থ

বাংলাদেশের ফুটবলে ছেলেরা বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা ফুটবলের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন।

এদিকে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দুটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট জয় করল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব–১৫ বছর বয়সী মেয়েরা। তারা ভেসে যাচ্ছে প্রশংসা আর অভিনন্দনের বন্যায়। অনেকের মনেই প্রশ্ন আসছে, মেয়েরা কীভাবে এত ভালো করছে? কীভাবে প্রতিপক্ষকে তারা ভাসাচ্ছে গোলবন্যায়! প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ—সঠিক পরিকল্পনা আর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণই মেয়েদের ফুটবলে প্রতিভাবান প্রজন্ম তৈরি করছে। মেয়েদের সাফল্যের বিপরীতে উল্টো চিত্র ছেলেদের ফুটবলে। সেখানে নেই দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা, নতুন খেলোয়াড় তৈরির পদ্ধতিগত প্রয়াস।

মেয়েদের এই সাফল্য উদ্‌যাপনের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের নিয়ে আক্ষেপ অনেকেরই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যদি মেয়েদের ফুটবলের জন্য দারুণ দারুণ সব প্রতিভা বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে ছেলেদের বেলায় তা হবে না কেন! আসল কথা হচ্ছে, ছেলেদের ফুটবলেও প্রতিভা বেরোয়। কিন্তু ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না বলে প্রতিভাগুলো ঝরে পড়ে অঙ্কুরেই। আমাদের বয়সভিত্তিক দলগুলো নিয়মিতই সাফল্য পায়, কিন্তু সেই দলগুলোকে একসঙ্গে রাখা, তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ কোনো দিনই নেওয়া হয় না।

এই তো কিছুদিন আগে কাতারে এএফসি অনূর্ধ্ব–১৬ বাছাইপর্বে বাংলাদেশ স্বাগতিক কাতারকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল। বয়সভিত্তিক হলেও বাংলাদেশের ফুটবলে যা অবিস্মরণীয় জয়। দারুণ প্রতিভাবান সব খেলোয়াড় চোখে পড়েছিল দলটিতে। তাদের নিয়ে চার বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। ক্যাম্প শুরুও হয়েছিল। কিন্তু এক মাস পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। কাগজে-কলমে খেলোয়াড়দের ছুটি দেওয়া হলেও সেই ছুটি আজও শেষ হয়নি।

২০১৫ সালে সাফ অনূর্ধ্ব–১৫ ফুটবলে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। সে দলটাও ছিল প্রতিভাবান ফুটবলারে ঠাসা। বেশ কয়েকজনকে দেখে তো মনে হয়েছিল, এই বুঝি বাংলাদেশের ফুটবলে তারকার আকাল মিটতে যাচ্ছে। কিন্তু কিসের কী! সেই দলটিকেও চার বছর একসঙ্গে রাখার ঘোষণা দিয়ে পিছিয়ে গেছে বাফুফে।

ছেলেদের বয়সভিত্তিক দল নিয়ে বাফুফে নির্লিপ্ত। ছেলেদের বয়সভিত্তিক দল নিয়ে বাফুফে নির্লিপ্ত। কাতারকে হারানো প্রতিভাবান দলটিকেও ধরে রাখা যায়নি। বন্ধ হয়ে গেছে সিলেটে বাফুফের ফুটবল একাডেমি। অর্থাভাবে সেটির কার্যক্রম নাকি নতুন করে শুরু করা যাচ্ছে না। অথচ এই একাডেমির ফসলই ছিল সাফ অনূর্ধ্ব–১৫ ফুটবলজয়ী দলটা। ছয় মাস একাডেমি চালিয়েই সাফল্য এসেছিল। সেটা চালিয়ে গেলে এত দিন হয়তো আরও কিছু সুফল পেত বাংলাদেশের ফুটবল।

কাতারকে হারানো দলটাকে ধরে রাখতে না পারার আক্ষেপ ঝরেছে সে দলের ম্যানেজার অমিত খান শুভ্রর কণ্ঠে, ‘মেয়েদের এ সাফল্য এক দিনে আসেনি। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের পর এখন সাফল্য পাচ্ছে। কিন্তু আমরা ছেলেদের নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছি না। ছেলেদের নিয়ে পরিকল্পনা করা গেলে নিঃসন্দেহে ছেলেরাও মেয়েদের মতোই ভালো করত। আমরা মাত্র কয়েক মাসের অনুশীলন নিয়ে কাতারকে হারিয়েছি।’

মেয়েরা প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে একই কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের অধীনে অনুশীলন করে যাচ্ছে। কিন্তু ছেলে বয়সভিত্তিক দলের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প করা হয়নি।

তাই মেয়েদের এ সাফল্যের পেছনে মহিলা কমিটির প্রশংসা করলেন বাফুফের সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ও বর্তমান কোচেস এডুকেশন সমন্বয়কারী জোবায়ের নিপু, ‘মেয়েদের এই সাফল্যের পেছনে মূল কৃতিত্ব মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের। তিনি তার মেয়েদের জন্য সবকিছুই বাফুফের কাছ থেকে আদায় করে নিতে পেরেছেন। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে আমরা পারছি না। আমাদের ছেলেদের যদি এ সুযোগটা দেওয়া হয়, আমরাও পারব।’

সুযোগটা দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই যে বাফুফের নেই। হংকংয়ের যে প্রতিযোগিতায় মেয়েরা শিরোপা জিতে এল, সেখানে নাকি ছেলেদেরও একটি টুর্নামেন্ট হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। ছেলেদের বিভাগে সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে ভারত। এতে খেলার সুযোগ পেলে অনূর্ধ্ব–১৫ দলটাকে তো একসঙ্গে করা যেত!

একসময় জেএফএ কাপ অনূর্ধ্ব–১৫ ফুটবল হতো ছেলেদের নিয়ে। কিন্তু এখন সেটা হয়ে গিয়েছে মেয়েদের টুর্নামেন্ট। মেয়েদের নিয়ে টুর্নামেন্ট করা হয়েছে খুবই ভালো। কিন্তু ছেলেদেরটা বন্ধ করে কেন!

মেয়েরা ভালো করছে। আরও ভালো করার আছে অনেক সম্ভাবনা। কিন্তু দেশের ফুটবলের মান বিচার হয় কিন্তু ছেলেদের ফুটবল দিয়েই। সে জায়গায় বাফুফে নজর দেবে কবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*