W3vina.COM Free Wordpress Themes Joomla Templates Best Wordpress Themes Premium Wordpress Themes Top Best Wordpress Themes 2012

মাদকের ক্ষণস্থায়ী স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর ফাঁদ, মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকার

Filed under: গল্প,সাহিত্য |

shakil

শাকিল মোল্লা ॥
মাদক গ্রহণের ফলে প্রাথমিক সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। এই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর ফাঁদ। ফাঁদে একবার জড়ালে স্বাস্থ্যহানি ঘটে, সৃজনীশক্তি শেষ হয়ে যায়। ‘স্বাস্থ্যহানি’ বলতে কেবলই দৈহিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হচ্ছে না। দেহের পাশাপাশি বিশৃঙ্খল ও বিধ্বস্ত হয়ে যায় মনের স্বাস্থ্য, পুড়ে যায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক চিত্রে নেমে আসে দুর্যোগ। পারিবারিক বিপর্যয়গুলো বিশেষজ্ঞদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই সর্বনাশ মোটেও বিচলিত করে না মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রকে। তারা বোঝে ব্যবসা। তারা বোঝে বাণিজ্য। মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্রই চালিয়ে যাচ্ছে সর্বনাশা খেলা; তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছে মরণনেশার উপকরণ। সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে ধ্বংসের ¯্রােতে ভেসে যাচ্ছে অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী।
মাদকাসক্তির কারণ:
মাদকাসক্তির বড় কারণ মাদকের সহজলভ্যতা, মাদকের প্রতি তরুণ প্রজন্মের কৌতূহল ও নিছক মজা করার প্রবণতা, মাদকের কুফল সম্পর্কে প্রকৃত ধারণার অভাব, মাদক বিষয়ে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি—‘আমি ইচ্ছা করলেই মাদক ছাড়তে পারি’, পরিবারের ধরন, বাবা-মায়ের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি, বন্ধুদের চাপ প্রভৃতি। পারিপার্শ্বিক কারণ মাদক নিয়ে স্মার্ট হওয়ার প্রবণতাও অনেককে ঠেলে দেয় মাদকের জগতে। উইথড্রয়াল ইফেক্ট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যও মাদক সেবনের জালে জড়িয়ে যেতে থাকে আসক্তজন। মানসিক সমস্যার কারণেও মাদকাসক্তি ঘটতে পারে। বিভিন্ন চিহ্নিত স্থানে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে কেনাবেচা হয় মাদক। পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিভিন্ন ওষুধ বিক্রয় করা হয়, যা মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হয় চড়া দামে। বন্ধু-বান্ধবের চাপে পড়ে, তাদের সঙ্গ দিতে গিয়ে এবং তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে মাদক গ্রহণে বাধ্য হয় এবং এক পর্যায়ে আসক্ত হয়ে পড়ে। নিজেকে ‘স্মার্ট’ দেখানোর জন্য অনেকে মাদক নেয়, কেউ নিছক মজা করে একবার-দু’বার নিতে নিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। অনেকে প্রথমে কৌতূহলের বশে মাদক গ্রহণ করে, ভাবে সে আসক্ত হবে না; কিন্তু এক পর্যায়ে সেও আসক্ত হয়ে পড়ে। বেকারত্ব, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি, পরীক্ষায় ফেল ইত্যাদি নানা কারণে মাদকের কাছে আশ্রয় নেয় তরুণ-তরুণীরা। মাদকের খপ্পরে পড়ে নিজের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে কেউ কেউ। ব্যক্তিত্বের কিছু সমস্যা যেমন এন্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি, শৈশবে বিকাশের সমস্যা, পারিবারিক কারণেও মাদক গ্রহণের জন্য দায়ী। টানাপড়েন ইত্যাদি কারণেও মাদকে আসক্ত হয়ে যায় অনেকে। সিগারেট দিয়েই শুরু হয় নেশার জগতে প্রথম প্রবেশ, তাই সিগারেটকে আপাত নিরীহ মনে হলেও এটা মাদকের জগতে প্রবেশের মূল দ্বার খুলে দেয়। তাই ধূমপানও হতে পারে মাদকাসক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। একটা পর্যায়ে শরীর ও মন এমনভাবে মাদকনির্ভর হয়ে পড়ে যে চিকিৎসা ছাড়া আর কোনোভাবেই মাদকমুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না।
মাদকাসক্তির পরিণতি:
দীর্ঘ সময় লেখাপড়া, স্লিম থাকা ও বেশি সময় যৌনক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ছাত্র-ছাত্রী, মডেলকন্যা ও অভিনেত্রী কিংবা সুন্দরী গৃহবধূরা ব্যাপক হারে ইয়াবা আসক্ত হয়ে তাদেরও জীবন বিপন্ন করে তুলছে। তাদের গড় আয়ু অনেক কমে যায়। ইয়াবা-আসক্ত অধিকাংশ সাধারণত শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তান কিংবা সদস্য। এই ট্যাবলেট খেলে খাবারের রুচি কমে যায়, ঘুম কমে যায়, না খেতে খেতে তারা রোগাটে হয়ে যায়। এ অবস্থাকে মনে করে স্লিম হওয়ার একটা উপায়। ব্যবহারে প্রাথমিক অবস্থায় যৌন উত্তেজনা কিছুটা বাড়ে। এরপর কমতে থাকে। বছরখানেক ব্যবহারের পর যৌন ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসা দিয়েও কোনো লাভ হয় না।
মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণতির কথা পত্রিকার পাতায় দেখতে পাই আমরামাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে তার পরিবারের নিকটজনের হত্যার খবর দেখি, আবার পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছে এমনটাও দেখি। মাদকাসক্তির কারণে স্নায়ুুতন্ত্র, হৃদযন্ত্র, যকৃত, ফুসফুস, প্রজননতন্ত্র, কিডনি, পাকস্থলীসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শিরায় মাদক গ্রহণের কারণে হেপাটাইটিস বি, সি, যৌনবাহিত রোগ ও এইচআইভি সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘ সময় মাদক গ্রহণ করলে মানসিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নেশা গ্রহণকারী। মাদকের টাকা জোগাতে চুরি, ছিনতাই, দেহব্যবসা ইত্যাদি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তারা। কেউবা সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়, চাকরিচ্যুত হতে হয় কাউকে কাউকে। চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় মাদক গ্রহণ করতে না পারলে ‘উইথড্রয়াল’ সিনড্রোম দেখা যায়, এসময় নানা রকম শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
মাদকাসক্তির লক্ষণ:
মাদক গ্রহণকারীর চিন্তা ও আচরণের পরিবর্তন দেখা যায়। তার চিন্তা-ভাবনা হয়ে উঠে বিক্ষিপ্ত, কোনো কিছুতে বেশিক্ষণ মনোসংযোগ করতে পারে না। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, শান্ত সুবোধ ছেলেটি হঠাৎ অবাধ্য হয়ে ওঠে। ঘুমের সমস্যা দেখা যায়, সারারাত জেগে থাকে আর পরদিন দুপুর ২টা-৩টা পর্যন্ত ঘোমায়। খাওয়া-দাওয়াায় অনিয়ম দেখা যায়। খিদে কমে যায়, বমিভাব দেখা দেয়। বাসায় ঠিকমত খায় না, গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে, কোনো কোনো দিন বাসায়ই ফিরে না। কারণে-অকারণে মিথ্যা কথা বলে। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে নানা উছিলায় বাবা-মার কাছে টাকা চায়, টাকা না পেলে রাগারাগি করে। শরীর ভেঙে পড়ে, দুর্বল হয়ে যায়। হাত-পা কাঁপতে পারে। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়, পড়ালেখার মান কমে যায়, চাকরি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। বাথরুমে বেশি সময় কাটায়। নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবী তৈরি হয়, পুরনোদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে। ঘন ঘন মোবাইলের সিম বদলায়। ঘরের ভেতর মাদক গ্রহণের বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যায়। বাসার জিনিসপত্র/ টাকা-পয়সা/মোবাইল ফোন চুরি হতে থাকে। অনেক সময় বিনা কারণে খুব উৎফুল্ল বা খুব বিষন্নতা দেখা দেয়। অসংলগ্ন কথা বলা বেড়ে যায়। স্ত্রী-স্বামীর সঙ্গে সবসময় ঝগড়াঝাটি লেগে থাকে, স্বাভাবিক যৌনজীবন ব্যাহত হয়। সবসময় উৎকণ্ঠা বা অহেতুক ভীতির মধ্যে থাকে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো বর্জন করে। শখের পরিবর্তন ঘটে। যেমন দেখা যায় আগে গান শুনতে বা বই পড়তে ভালোবাসত, কিন্তু এখন আর সেগুলো ভালো লাগে না। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যকে অহেতুক সন্দেহ করা শুরু করে। উপরের সবগুলো লক্ষণ একসঙ্গে যেমন সব মাদকাসক্তের মধ্যে থাকে না, তেমনি উপরের লক্ষণগুলো মাদকাসক্তি ছাড়াও ভিন্ন কারণে হতে পারে। তাই নিছক সন্দেহের বশে কাউকে মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মাদকাসক্তি নির্ণয় করা প্রয়োজন।
পরিবারের করণীয়:
পারিবারিক পরিবেশ হতে হবে ধূমপানমুক্ত। সন্তানদের কার্যকলাপ এবং সঙ্গীদের ব্যাপারে খবর রাখতে হবে। সন্তানরা যেসব জায়গায় সবসময় যাওয়া-আসা করে সে জায়গাগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে করে তারাই নিজে থেকে তাদের বন্ধু-বান্ধব ও কার্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা করে। পরিবারের সব সদস্যই ড্রাগের ক্ষতিকারক বিষয়গুলো সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করবেন। ধৈর্য ধরে সন্তানদের সব কথা শোনার জন্য অভিভাবকরা নিজেদের প্রস্তুত করবেন। সন্তানদের মঙ্গলের জন্য পরিবারের সদস্যরা যথেষ্ট সময় দেবেন। সন্তানদের সামাজিক, মানসিক, লেখাপড়া সংক্রান্ত অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো যথাসম্ভব মেটাতে হবে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিয়ে তাদের প্রত্যাশা বাড়তে দেয়া যাবে না। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, প্রায়ই তারা সবাই মিলে আনন্দদায়ক কিছু কার্যকলাপের পরিকল্পনা করবেন এবং পরিবারের সবাই মিলে সুন্দর সময় কাটাবেন। ‘গুড প্যারেন্টিং’ বিষয়ে জ্ঞান নিতে হবে বাবা-মাকে।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা:
জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে এই ভয়াবহ সমস্যাটি মোকাবিলা করতে হবে। প্রশাসনকে মাদকের উৎপাদন এবং এর অবৈধ ব্যবসা নির্মূল করতে হবে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে আসক্তির ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাদকবিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে সবাইকে এর কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। মাদকাসক্তির নির্বিষকরণ প্রক্রিয়ায় শরীরের সঙ্গে মাদকের জৈব-রাসায়নিক নির্ভরশীলতা দূর হয়ে শরীর তার নিজস্ব গতি-প্রকৃতিতে ফিরে এলেও মাদক গ্রহণের মূল প্রভাবক (ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাধারা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসঙ্গতি) দূর করার জন্য নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও থেরাপি প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিশেষে মনে রাখতে হবে, নিকোটিন ও অ্যালকোহলও মাদক হিসেবে স্বীকৃত। এই মাদকও ক্ষতি করে দেহ-মন, ধ্বংস করে পারিবারিক সম্প্রীতি, সন্তানদের ঠেলে দেয় মাদক গ্রহণের ঝুঁকিতে। সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ধূমপান ছাড়াতে হবে, ছাড়তে হবে মদ্যপানও। ।

শাকিল মোল্লা
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদক
কুমিল্লা দর্পণ
মোবাইল: ০১৮১৮ ১০৩২২৫

You must be logged in to post a comment Login