W3vina.COM Free Wordpress Themes Joomla Templates Best Wordpress Themes Premium Wordpress Themes Top Best Wordpress Themes 2012

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম এর চিরকুট সিরিজ ১ম পর্ব (১-৯)

Filed under: সাহিত্য |

12835025_1308603692488379_677173019_n১. বিষন্ন আলোয় বসে থাকার দিন আর কত! তোমাকে দেখেছি সেই আদি শৈশব, ভিজে কুয়াশার মাঠ পেরিয়ে সর্ষে ক্ষেতে নামা সকাল রোদ্দুরে। তারপর রোদ্রের কিরণ যত প্রশস্ত আর পূর্ণ হতে লাগলো তোমাকে হারিয়ে ফেলার শুরু তখন থেকে। কোথায় থাকো তুমি? একলা একা বিকেলে জলের পাড় ধরে নিমগ্ন বসে থেকে জেনেছি প্রতিবেশী সকল সবুজ আর জল ও আমার মতো বিষন্নতায় ভোগে। কাকে কি বলি, এইসব জল এইসব দুঃখী গাছপালা তবে আমার মতোই তোমার মুখাশ্রয়ী? একেকটা রাত নামে হাজার রকম দুঃস্বপ্ন আর পরবর্তী অনিশ্চিত দিনের বার্তা নিয়ে। অন্ধকার রাত্রির মতো রক্তে ঢুকে পড়া জাগতিক ভয় নিয়ে আরেকটি সকাল হয়, আরেকটি দিন। সেই রোদ্দুর আর আসে না ফিরে, সেইসব ঘন কুয়াশার মাঠ, ভেজা পথে আঁকা নিজস্ব পা দেখিনা আর কোনদিন। এভাবে আর কত, কবে ফিরে আসছো তুমি যাবতীয় অপূর্ণতা ভুলাতে এখানে, বিষন্ন মুখের বিপরীত? কবে আসছো তুমি অলৌকিক স্পর্শ নিয়ে আমার উঠোনে, এই অস্থির হৃদয়?

 

২.
মুখোমুখি না বসার এই লাভ, কি-বোর্ডে শব্দ ঝড় আর বলছি তোমায় এইসব অস্থির দিনে কেমন থাকো? এই অন্ধকার গন্ধমাখা দিনযাপন কি তোমাকেও পোড়ায়? না কি বৈপরীত্যের দিন পেয়েছো ইচ্ছেমতো? পৃথিবীর কোন উল্টো পথে স্বপ্নরা কি এখনো আকাশভর্তি জ্যোৎস্না পাঠায়? আর স্বপ্নের গাঁয়ে উল্কি আঁকতে গিয়ে হাসিচ্ছলে লিখো দুঃখ নদীর গান? আমি এখন জলের ভাঙনে দেখি নিজস্ব মুখ। আর খুব করে ডাকি পৃথিবীর শেষ বাদক কে, ঠোঁটে নিচ্ছে কবে সেই সে বাঁশি? আর ওদিকে কি তুমি যাপিত সৌন্দর্য্যের প্রশংসায় টুকে দিচ্ছো নোট, হে ঈশ্বর দীর্ঘায়িত হোক এ পরিভ্রমন! আমাদের মুহুর্তরা এমন বৈপরীত্যমাখা কেন?

 

৩.
কবিতা লেখার চেয়েও দুষ্কর এই চিঠি চিঠি খেলা। পত্র লিখার আদি প্রারম্ভিকা ভেঙ্গে তোমাকে দিই মেঘে ডুবু ডুবু রোদ্দুর। কেমন স্বর্গীয় আবহ আজ খেলছে আকাশজুড়ে সেসব শব্দে না কূলালেও তুমি নিশ্চিত বুঝতে পারো সে বিশ্বাস রেখে থেমে যায় কাগজ-কলম। তোমার কি বিস্ময় কাজ করে আমার মতো, নাকি এই আবহ চিরকাল ধরে রাখো বলে এইসব অভ্যর্থনাদি বড্ড একঘেয়ে ঠেকে? তাতে আমার কি আসে যায়! সাধ্যির মধ্যে যা কুলোয় তার সবটুকুর বাইরে দিতে না পারার সীমাবদ্ধতাও না বুঝলে এই অ-লেখকের পত্র লিখন বড্ড বাজে যায়। আমি তোমাকে কেন লিখি? তার কোন উত্তর জানিনে, শুধু জানি এই না দেখা না জানায় শব্দ ছুঁড়ে ফেলার ক্ষণ আর দশটা দুঃসময়কে আড়াল করে, যে সব তুমি জানবে না কোনদিন। দখিন হাওয়ার বুক পকেটে এ শব্দ জুড়ে দিয়ে আমি আবার যাপিত বেদনায় ফিরে যাবো যখন সে আমার প্রতিদিনকার লিপি। আর এই ক্ষনিকের স্ফুটন, তোমাকে ঘিরে শব্দের উড়াউড়ি যতক্ষন থাকে ততক্ষণ ভিন্ন আমি, এ অন্য আনন্দ। বার বার চিঠি লিখার গুমড় কি এটাই, বার বার তোমাকে ছুবার প্রত্যয়? বার বার দুঃখ সব কে ভূলে থাকার অভিসন্ধি? ভীষণ স্বার্থপর মনে হলেও এই স্বার্থপরতা নিয়েই বার বার যেন আসি, এরকম আশিস দিতে কি আড়ষ্টতা কাজ করবে তোমার?

 

 

৪.
আজকের সন্ধ্যা কি অন্য সব সন্ধ্যার চেয়েও বিষন্ন? কেমন ভুতূড়ে স্তব্ধতা নেমেছে চারপাশ জুড়ে। আকাশ ভর্তি ধুলো উড়ে আসন্ন নক্ষত্রের আগমনীকে বিপদ সংকেত দেখিয়ে কি দীর্ঘ অন্ধকার রাত্রির আভাস দিচ্ছে? আমি কেন প্রলাপ বকছি এই অবেলায়? চিরদিন নিরুত্তর প্রশ্নগুলো খাতায় আকিউকি করার যে ভিন্নমাত্রার সুখ, তার লোভে? সমস্ত বিকেল জুড়ে স্বপ্ন সৌন্দর্য্যের পুস্তিকা আউড়ে গেলাম, আঙুল দিয়ে কি সুনিপুন রেখাচিত্র একে গেছি অদৃশ্য ক্যানভাসে, শরতের বিকেল জুড়ে তুমি আসছো আমার দিকে, পা থেকে উৎসারিত নুপূরের ধ্বনিতে মন্ত্রমুগ্ধ চারপাশ। এক বিকেলে কাশবনে যাওয়ার সম্মতিও দিয়ে রাখলাম তোমাকে, তুমি চাইলে একটি কবিতার শুরু ‘আমরা দুজন, কাশবনের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি অনন্তে’। কি দারুন না, এই অন্ধকারেও যখন ভাবি তুমি আছো প্রতিশ্রুতিয়, পায়ে পায়ে; অফুরান সুখে নেচে উঠে মন। সকল অপূর্ণতা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, যেন অসুখের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এখানে। অথচ তুমি টা কে? হঠাৎ কে প্রশ্নটা রাখে হৃদয়ের ঘন্টায়, আর একটা সুর বিষন্ন হয়ে মিশে যায় রক্তে আমার। কেন এমন হয়, সুখ স্বপ্ন আর অদৃশ্য ক্যানভাসের ভেতর ঘন্টি বেজে যায়? আর সব কিছু অলীক জেনে ভীষণ মন খারাপ হয় আমার, ভীষণ মন খারাপ। আগাম শীতের মতো বিষন্নতা নামে হৃদয়ের উঠোন জুড়ে।

 

৫.

অনেক কিছুই করবার ছিলো, করা হয়নি। প্রবারণার রাত্রি গেলো, আকাশের চেহারা দেখারও সাহস হয়নি। তবুও পরবর্তী এক সুন্দরী রাতে সহস্র আলোর রোশনাই হাতে নিয়ে দেখা হয়েছিলো আমাদের। সমস্ত অলিগলি যেন বকেয়া শপথ মেটাবার শপথ থেকে প্রশস্ত হাসিতে মাতিয়ে তুলছিলো আকাশ। কেউ কি বললো, দূর ছাই, এখনো প্রবল আঁধার, অসুস্থ বাতাসের ঘন্টাধ্বনি কেবল শুনে এলাম! আমি বলি কি বাদ দাও এসব, হাত ভর্তি এতো এতো বাতি গুনার সাধ্যি কার। মন থাকতে হয়, মন আছে বলেই না আমরা ফিরে এলাম শান্ত জলাধারের পাশে। মন আছে বলেই না নিশ্চিত করে বলে দিতে পারলাম এখন অভয় সময় যদিও ঈশ্বরের ঘড়িতে মধ্যরাত। তারপর ধরো সব বাতি ফিউজ হলো, একে একে নিভে গেল উর্ধ্বাকাশের সব তারা। আমরা তো তখনো বাতি খুঁজে নেব পরস্পর মুখের থেকে, চোখের থেকে, ঠোঁট থেকে বেরোনো কথার ভিতর। তোমারও তো তাই মনে হচ্ছে, তাই না?

 

৬.

তোমাকে লিখবো লিখবো ভাবনার পর কলম থেকে যে শব্দগুলো বেরোয় না সেগুলোই মিলেই তো চিঠি। তুমি কি শব্দবিহীন চিঠির ভাষা বুঝতে পারো, চিঠি ছুঁয়ে অনুভব করতে পারো কাগজের ভাঁজে ভাঁজে থাকা স্পর্শ? বোধ করি পারো, না হয় এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে এতো ভালোবাসাবাসি, এত এত আদরমাখা কবিতার ছড়াছড়ি হবে কেন? সামান্যতম অভিসন্ধিতে অনুভব করতে পারার ক্ষমতাগুলো আছে বলেই তো পৃথিবীতে এত গান, এত হাসাহাসি। এই সব বেঁচে থাকা, অবসন্ন রাত্রির পর আলো ছড়ানো সকাল; যেভাবে নিরব সম্পর্কের রেখা বয়ে যায় আকাশ থেকে মাটিতে তাদের রহস্যানুসন্ধান করতে গেলে পাবে নৈঃশব্দ বার্তার চলাচল, অলৌকিক চিঠি। আমি সামান্যতম, তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছুঁড়ে পাঠাই স্পর্শ কাগজ। যদিবা কাগজ ও খুঁজে না পাও ব্যতিব্যস্ত সময়ের কারণ, উড়ছে দেখো প্রজাপতি, পেয়েছে পালক তার চিঠির কাগজে। উড়ছে দেখো অনুভূতির স্রোত, অনুচ্ছারিত শব্দগুচ্ছের প্রয়াণ থেকে ধুলো-বালি।

 

৭.

এই মধ্যরাত্তিরে তোমাকে কিছু লিখার মানে হয়? আমি যখন ঘুম কে অস্বীকার করে কলমকে মৃদু বলছি কেমন আছে সে? কলম ও প্রায় নিদ্রা যায়। আমি কি তবে ফিরে যাবো মিথ্যে ঘুমে, ভাবনার সমুদ্রে? তোমাকে দেখিনা কতদিন, দেখেছি কি কোনদিন? গভীর রাতে নিজস্ব শ্বাস যখন দ্বৈত সুর তুলে, তখন কি ঘোরগ্রস্ততা আচ্ছন্ন করে, মনে হয় তোমার শ্বাস নিয়ে কেটে যাচ্ছে আমার সময়। কেমন আছো তুমি, ভণিতা না রেখে তোমাকে বলি। কেমন সহজাত তোমার ভূলে যাওয়া, আমি আশ্চর্য হই। তোমার কি মনে পড়ে, না কি থাকো বিপরীত ভাবনায়, নক্ষত্রের শহরে ঘুরে আসো সংগোপন। তোমাকে ভাবনার সৌন্দর্যের উল্টোপিঠে এক গভীর বিচ্ছিন্নতা নিয়ে কাটে অন্ধকার রাত্রি, যখন পরোক্ষ শব্দমালায় অস্বীকার করো পরিচয়, আমি ছটফট করি গভীর বেদনায়। মনে হয় বেদনা সুখের দ্বিখণ্ডিত মানচিত্রে চলে যাচ্ছি বহুদূর, ভিন্ন করিডোর।

 

৮.

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় তোমাকে খুব করে লিখি। আমার উড়াউড়ির গল্প বলি, কিভাবে এক বিষন্ন পালক পাখির শরীর ছেড়ে পথে নামে। তোমাকে বলি একটা বিস্তৃত আকাশের কথা, মেঘের সাথে যুদ্ধে হেরে অবিরাম কাঁদছে যে। তোমাকে কিছুই বলি না আসলে, তোমাকে বলার মতো লিখতে না পারা, নাকি দীর্ঘ এক প্রতিবন্ধকতা কাজ করে আমাদের মধ্যে। যখন তোমাকে ভাবি, ভীষণ লাজুক আলোয় হৃদয় কেঁপে উঠে কোন অলৌকিক ভয়ে। শুধুই কি অলৌকিক, চিরদিন স্পর্শের দূর দূরত্বে থাকার নিশ্চয়তাকে কি বলা যায় আর? তবুও মাঝে মাঝে কোন এক ঘোর কাজ করে, অদ্ভূত উন্মাদনায় ঘরের বাইরে নিজেকে দেখি, ছাতিম ফুলের গন্ধ মেখে যেন দাঁড়াতে যাচ্ছি তোমার দরজায়। অথচ তোমার ঠিকানা কি আদৌ জানি? ভীষণ ব্যাকুলতা কাজ করে, এই শূন্য শূন্য হাওয়ার ভেতর তোমার নাম বাজে। প্রায় অন্ধকার আলোর ভেতর অদ্ভূত সুর তুলে তুমি হেঁটে যাও সম্মুখে। এতো জ্যোৎস্না মাখো তুমি মেয়ে, এতো মায়া নিয়ে আমাকে বৃত্তবন্দি করে রাখো তোমার ভেতর। আমার কি কেবলই ভ্রমণ এই অলৌকিকের সমস্ত পথ, তোমার দরজায়? এভাবেই যেন বারে বারে ঘুরে আসি নিমগ্ন যাযাবর। তোমাকে এসব বলতে ইচ্ছে করে হে জাফরান রঙা মেয়ে…

 

 

৯.

প্রায় শীত রাত্রির বিষন্নতা মাখা গভীরে অনিদ্রার মত অসুখে জেগে উঠা তোমার মুখ অন্ধকার দৈর্ঘ্যের ভয় টেনে কিরকম এক হাহাকার তোলে। ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি মুহূর্তকে তোমাকে আজন্মকাল না দেখার মতো ম্লান মনে হয় আর পার্শ্ববর্তী পুকুরে জলশব্দকে তোমার প্রথম পদার্পন আনন্দ অপ্রস্তুত রোমাঞ্চের অভিমিশ্র অনুভূতির বাদ্য মনে হয়। এ ভয়, এ উৎকন্ঠার বিপরীতে আমি দিনপঞ্জি ভরে যে তোমাকে চমকে দেয়ার প্রয়াস করি তা যেন সত্যি বিস্ময় হয় তার জন্য জানলার উপর টিকটিক সংকেতবাহী দুটো টিকটিকিকে নিমন্তন্ন করি প্রতিটি রাত। সুগন্ধি বনফুল মেখে এ নিরালায় তুমি কি তৃতীয় চক্ষুয় দেখো এ প্রস্তুতিনামা? জাগরিত রাত্রির দীর্ঘ অপেক্ষার মতো এ বিহ্বল সৌন্দর্য্যে বসে আমি তো লিখি অনিশ্চিত প্রেমপর্ব। বুকের মাঝে ব্যাপক বৃষ্টিপাত নিয়ে অসময়ে লিখি শিউলি শিউলি গন্ধ, অসুখকে পাশকাটানো আনন্দ-ভৈরবী।

You must be logged in to post a comment Login